Total Pageviews

Monday, January 03, 2011

CHT: Let land law be the safety key of the indigenous land

Courtesy: Shamakal, Dhaka, 3 Jan, 2011
Web: http://www.samakal.com.bd/details.php?news=23&action=main&menu_type=&option=single&news_id=121166&pub_no=562&type=

পার্বত্য চট্টগ্রাম
ভূমি আইন হোক আদিবাসী ভূমির রক্ষাকবচ

অভয় প্রকাশ চাকমা

ভূমি কমিশন গঠন করলে আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় যাতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ থাকে এদিকটি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা দরকার। তাদের বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধার হবে ভূমি কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব


সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার জয়নগাছায় আয়োজিত গারোদের ওয়ানগালা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, সমতলের আদিবাসীদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হবে না। তাদের ভূমি সমস্যা সমাধানে সরকার পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করছে। সমভূমিতে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব ভূমি অধিকার পাবে।
বাংলাদেশের সব আদিবাসীর ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অভিন্ন। ঐতিহ্যগতভাবে ভূমির ওপর আদিবাসীদের নিজস্ব কোনো মালিকানা ছিল না। যিনি যে পরিমাণ ভূমি ব্যবহার করতেন, প্রথাগতভাবে সেটিই তার মালিকানায় থাকত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকত সামাজিক মালিকানা, ব্যক্তি শুধু চাষের অধিকার ভোগ করতেন, মালিকানা স্বত্ব থাকত না। রাষ্ট্রের আওতায় আসার পর আদিবাসী অঞ্চলে চালু হয় ভূমির ওপর ব্যক্তিমালিকানা। ব্যক্তিমালিকানায় ভূমির রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি আদিবাসীদের ধারণার মধ্যে না থাকায় এর সুযোগ নেওয়া আরম্ভ করল সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী। তখন থেকেই শুরু হয়েছে ছলে-বলে-কৌশলে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে ভূমি দখল, যা এখনও থামেনি।
পাহাড়ের আদিবাসীরা স্বাধিকারের জন্য রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আন্দোলন করে আসছে। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও ভূমি অধিকার রক্ষা করতে সমভূমির আদিবাসীরাও আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলনে তাদের অনেকে হতাহত হয়েছেন। ১৮ আগস্ট ২০০১ নওগাঁ জেলাধীন মহাদেবপুর থানার ভীমপুর গ্রামের আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। ভূমি রক্ষা করতে গিয়ে এভাবে নবাবগঞ্জ জেলার বাবুলাল হাঁসদা, নওগাঁ জেলার গান্ধারী ওরাওঁসহ অনেক আদিবাসী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অগি্নসংযোগ, উচ্ছেদ করে ভূমি দখল, জোর করে ফসল কেটে নেওয়া, ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতন চলে আসছে আদিবাসীদের ওপর।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রাণভয়ে হিন্দুদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি আইন করে দখল করে নেয়। তখন সমভূমির অনেক আদিবাসীও ভারতে চলে যান, পরে ফিরে এলে তারা কোনো সম্পত্তি ফেরত পাননি। তানোর থানাধীন অধিকাংশ সাঁওতাল মালিকানাধীন জমি এ কালো আইনের অনুবলে বাঙালিদের দখলে চলে যায়।
১৯৬২ সালে ভূমি জরিপের সময় যুগ যুগ ধরে আদিবাসীদের ভোগদখল করে আসা জমি তাদের নামে রেকর্ড হয়নি। এ সুযোগেও বাঙালিরা তাদের উচ্ছেদ করে সেসব ভূমি দখল করে নেয়।
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি বেদখল হতে হতে বর্তমানে সেখানকার তিন-চতুর্থাংশ আদিবাসী ভূমিহীন। পাহাড়ি আদিবাসীদের ভূমি উদ্ধার করতে পার্বত্য চুক্তির আওতায় ভূমি কমিশন গঠন করা হয়, সমভূমিতেও অনুরূপ ভূমি কমিশন গঠন করার দাবি জানিয়ে আসছেন সমভূমির আদিবাসীরা।
মধুপুরের বন ধ্বংসের জন্য আদিবাসীদের দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্যও আদিবাসীদের দায়ী করা হয়, যা সর্বাংশে মিথ্যা। আদিবাসীরা বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামে বসবাস করায় বন ধ্বংসের জন্য আদিবাসীদের দায়ী করা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে, তাই কাঠ চুরির জন্য নিকটস্থ আদিবাসীদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ একের পর এক মামলা করে থাকে। কাঠ পাচারে বন বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলে 'মামলা করা হয়েছে এবং বিষয়টা এখন আদালতের ওপর নির্ভর করছে' বলে পার পেয়ে যায়। দেখা গেছে, মামলা হওয়ার বিশ বছর আগে মারা যাওয়া আদিবাসীর বিরুদ্ধে পর্যন্ত কাঠ পাচারের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামবাসীর নাম খুঁজতে খুঁজতে এসব নাম জোগাড় করে মামলা করা হয়েছে, যাতে গ্রহণযোগ্য হয়।
একসময় মধুপুর ছিল শালবনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এডিবি থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে মধুপুর এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ১২.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে উডলট বন বাগান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। সামাজিক বনায়নের নামে শালবন ধ্বংস করে লাগানো হয়েছিল ইউকেলিপ্টাস ও অ্যাকাশিয়াসহ হরেক রকমের দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি গাছ। এছাড়া অ্যাগ্রো-ফরেস্ট্রি নামে আরও একটি প্রজেক্ট ছিল। প্রজেক্টের আবর্তনকাল সাত বছর নির্ধারিত ছিল; কিন্তু সাত বছর না হতেই সব গাছ চুরি হয়ে যায়। চুক্তি অনুসারে পার্টিসিপেন্টরা কাঠ বিক্রির ৪০ শতাংশের বদলে পেয়েছে কাঠ চুরির মামলা। পার্টিসিপেন্টদের অধিকাংশ ছিল আদিবাসী। জানা গেছে, দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে কাঠ পাচারকারীরা বনের গাছ কেটে নিয়ে উল্টো পার্টিসিপেন্টদের বিরুদ্ধে কাঠ চুরির মামলা দেওয়া হয়।
ভূমি কমিশন গঠন করলে আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় যাতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ থাকে এদিকটি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা দরকার। তাদের বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধার হবে ভূমি কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব। আদিবাসীরা কখনও ভূমিহীন ছিল না, ভূমিহীন করা হয়েছে। আইনে প্রথাভিত্তিক ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা এবং লব্ধ ভূমি রক্ষা করতে আদিবাসী ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের কাছে ভূমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। ১৯৫০ সালের 'ইস্ট বেঙ্গল স্টেট একুজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট'-এর ৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, 'কোনো আদিবাসী শুধু তার নিজ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির কাছে সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে পারবে। অন্য সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির কাছে আদিবাসীর কোনো সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে হলে সংশিল্গষ্ট এডিসির (রাজস্ব) পূর্ব অনুমতি লাগবে।' তবে এ ধারাটি এডিসিরা যথেচ্ছ ব্যবহার করায় আদিবাসীদের ভূমি রক্ষিত হয়নি। এজন্য আদিবাসীদের সম্পত্তি অন্য সম্প্রদায়ের কাছে হস্তান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইন পাস করা দরকার এবং এ আইনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তাও রাখা দরকার। সমভূমির আদিবাসীদের ভূমি উদ্ধার এবং আর যেন বেহাত হতে না পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করে প্রণীত হোক ল্যান্ড কমিশন আইন।

অভয় প্রকাশ চাকমা : কলাম লেখক
abhoychakma@gmail.com

No comments:

Post a Comment