Total Pageviews

Saturday, April 23, 2011

পাহাড়ে পুনরায় সংঘর্ষ :মূল সমস্যার সমাধান করিতে হইবে

Courtesy: Daily Ittefaq, Dhaka, Editorial, 20 April 3011
Web: http://new.ittefaq.com.bd/news/view/9336/2011-04-21/3

সম্পাদকীয়

পাহাড়ে পুনরায় সংঘর্ষ :মূল সমস্যার সমাধান করিতে হইবে
বুধ, ২০ এপ্রিল ২০১১, ৭ বৈশাখ ১৪১৮

আবারও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ভূমি দখল লইয়া সংর্ঘষের ঘটনা ঘটিয়াছে। আর এই ঘটনায় তিনজন বাঙালি, একজন পাহাড়ি নিহত হইয়াছেন এবং আহত হইয়াছেন ৩০ জন পাহাড়ি ও বাঙালি। প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে যে, খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় জনৈক বাঙালি অভিবাসী বিরোধপূর্ণ টিলায় প্রশাসনের নিষেধ সত্ত্বেও মাটি কাটিতে গেলে স্থানীয় আদিবাসীরা ধারালো অস্ত্র লইয়া হামলা চালায় এবং কর্মরত শ্রমিকদের আহত করে। পরে বাঙালিরা সংঘবদ্ধ হইয়া আদিবাসীদের উপর পাল্টা হামলা চালায় এবং আদিবাসী অধ্যুষিত কয়েকটি পাড়ায় ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। ঘটনার পর হইতে অত্র এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হইয়াছে।
জমি দখলকে কেন্দ্র করিয়া আদিবাসী ও বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সংর্ঘষ এই প্রথম নহে। ১৯৯৯ সালের ১৬ অক্টোবর খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় নিহত হইয়াছিলেন ৩ জন, ২০০৩ সালের ২৬ আগস্ট খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে নিহত হইয়াছেন ২ জন এবং ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাঙামাটির বাঘাইহাটে ২ জন ও খাগড়াছড়ি জেলা সদরে ১ জন নিহত হইয়াছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর হইতেই দেশের অন্যান্য অঞ্চল হইতে রাষ্ট্রের সহায়তায় বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড়ে বসতি স্থাপন শুরু করে। সাংসদ মানবেন্দ্র লারমা ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত সাক্ষাত্ করিয়া উপজাতীয়দের যে ৪ দফা দাবি উত্থাপন করিয়াছিলেন তাহার অন্যতম একটি দাবি ছিল সংবিধানে ১৯০০ সালের রেগুলেশনের সংশোধন-নিরোধ সংক্রান্ত বিধি রাখা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবি মানেননি। ১৯৭৪ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আদিবাসীদের পক্ষ লইয়া আন্দোলনে নামিলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া স্তিমিত হইয়া পড়ে। কিন্তু ১৯৭৯ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গোপন সার্কুলারের মধ্য দিয়া আবারও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাঙালি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধিমালার ৩৪ নং বিধিমালা সংশোধন করিয়া পুনর্বাসনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে এবং উক্ত সময় হইতে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ৪ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত হয়।
রাষ্ট্রযন্ত্র শুরু হইতেই এই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ববাদ বজায় রাখিয়াছে। দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাইবার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল; কিন্তু সুদীর্ঘ ১৩ বছরেও সেখানে শান্তি ফিরিল না। শান্তি চুক্তিও বাস্তবায়িত হয় নাই। পাহাড়ের মূল সমস্যা দুইটি — একটি হইল ভূমি সমস্যা, আরেকটি হইল আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির অপেক্ষা। রাষ্ট্রের দিক হইতে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি বসতি স্থাপনের কারণে ভূমি সমস্যা আরও প্রকট হইয়াছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক ভূমি কমিশন সমস্যা সমাধানে সরকারকে কিছু সুপারিশ করিয়াছে। তাহা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করিতে হইবে। আর ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসাবে তাহাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি। তাহা হইলে তাহাদের ‘নিজভূমে পরবাসী’ বোধটি দূর হইবে। উপরন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে না দেখিয়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিতে দেখিতে হইবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হ্রাস করিয়া অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় প্রশাসনিক ক্ষমতা বহাল রাখিতে হইবে। এইসব মূল বিষয়ের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের এই হঠাত্ অশান্তি চলিতেই থাকিবে।

No comments:

Post a Comment